অসম্ভবের হাতছানি

June 07, 2019

আজ বোধ হয় ট্রেনটা মিস্ হবেই।“…আপ তিস্তা তোর্সা এক্সপ্রেস পাঁচ নম্বর প্লাটফর্মে আসছে…” যাক এখনও আসেনি। হাঁফাতে হাঁফাতে স্টেশনে ঢুকল তৃষা। হাতঘড়িতে দেখলো দশটা। একটু দম ফেলে হাঁটা লাগলো ওভারব্রিজের দিকে।আজ মালদা স্টেশনে ভিড় টা একটু বেশিই মনে হচ্ছে না? আহ্, নিজেকেই আলতো করে বকে দিল তৃষা। কাল মহালয়া না! ওর মতো আরও যে অনেকে বাড়ি ফিরছে। একটা মৃদু হাসি ছুঁয়ে গেলো ঠোঁটের কোনায়। ওভারব্রিজের কাছে পৌঁছাতেই কেও যেনো হালকা টান দিল ওর হাতে। পিছন ঘুরে দেখে এক বৃদ্ধা।

“আমাকে একটু পাঁচ নম্বর প্লাটফর্মে পৌঁছে দেবে? খুব ভিড়, উঠতে পারছি না।”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়।চলুন।”

আস্তে আস্তে ভিড় ঠেলে ওনাকে নিয়ে পাঁচ নম্বর প্লাটফর্মে নামলো তৃষা।

“তোমাকে যে কি বলি, তুমি না থাকলে আমি এখানে আসতেই পারতাম না।” একটা চওড়া হাসি খেলে গেছে বৃদ্ধার মুখে। “আরে না না, একজন মানুষ হিসেবে আর একজনকে সাহায্য করা তো কর্তব্য।” হালকা হেসে বিদায় নিল তৃষা। গিয়ে দাঁড়ালো একটা ফ্যানের তলায়। বড্ড গরম আজকে! ওই বৃদ্ধাও কাছাকাছি একটা বসার জায়গায় এসে বসলেন। ট্রেন এখনও আসেনি। কিছুটা অস্থিরভাবে ঘোরাঘুরি করছিল ও। তবে চোখটা মাঝে মাঝে চলে যাচ্ছিলো বৃদ্ধার দিকে। উনিও যেনো বার বার ইতস্তত ভাবে ওর দিকেই তাকাচ্ছেন। শেষে আর থাকতে না পেরে ওনার সামনে গিয়ে প্রশ্নটা পেড় এই ফেললো তৃষা।

“আপনি কী আমাকে কিছু বলবেন?”

“না মানে, তুমি কি তিস্তায় যাবে?”

“হ্যাঁ” “বি - ওয়ান কামরা টা কোথায় দাঁড়াবে একটু বলতে পারবে?”

তৃষার কামরাও বি ওয়ান। “আপনি এখানেই কাছাকাছি থাকুন। আমিও বি - ওয়ানেই উঠবো। আপনাকে তুলে দেবো।”

“অনেক বড় হও মা।”

ট্রেন এলো কিছুক্ষণ পর। বৃদ্ধাকে নিয়ে ট্রেন উঠলো তৃষা। দেখা গেলো ওনার আর তৃষার একই কুপ। তাতে একটিমাত্র লোক সাইড লোয়ারে বসে বাসি খবরের কাগজ পড়ছে। জানালার এক দিকে গুছিয়ে বসলো তৃষা। বৃদ্ধা বসলেন উল্টো দিকে। ট্রেন ছেড়ে দিল।

“তুমি কোথায় যাবে?”

“জলপাইগুড়ি”

“ওখানে বুঝি তোমার বাড়ি?”

“হ্যাঁ”

বৃদ্ধা থামলেন একটু। তৃষা আড়চোখে দেখলো ওই দিকে বসা লোকটাকে। খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলেছেন। একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তৃষার দিকে। বিরক্ত হলো ও। মুখ ঘুরিয়ে নিল জানালার দিকে।

“আচ্ছা তুমি কি এখানে চাকরি করো?”

“না, পড়াশোনা করি।”

“কী পড়?”

“ডাক্তারি পড়ছি।”

“আমার মত বুড়োবুড়ি গুলো যেন আর কিছুদিন বেশি আয়ু পায় একটু দেখো।”

একটু হাসলো তৃষা। জিন্সের পকেট থেকে ফোনটা বের করলো। মাকে কল লাগালো।” হ্যাঁ মা ট্রেনে উঠে গেছি। কাল সকালে পৌঁছে যাবো। তুমি চিন্তা করো না।” তৃষা দেখলো বৃদ্ধা হাসছেন।

” আচ্ছা তোমার বাবা করেন?”

একি! ভদ্রমহিলা আরও প্রশ্ন করবেন! ওনার প্রশ্নবান যে থামছেই না।

” বাবা ইঞ্জিনিয়ার”

” আর মা?”

না! এই প্রশ্নটা যখনই কেও করে খুশি না হলে পারে না তৃষা। অধিকাংশ মানুষ বাবার পেশার খোঁজ নিয়েই ক্ষান্ত দেন। মায়েরাও যে কিছু করতে পারেন তা তাদের চিন্তার পরিসরের বাইরে। তবে ওনার মত বৃদ্ধা যে এই প্রশ্নটা করতে পারেন তা ভাবতেই পারেনি তৃষা।

“মা ব্যাংকে চাকরি করেন”

“কী পোস্টে আছেন?”

“এই কিছুদিন আগে ম্যানেজার হয়েছেন।”

ভদ্রমহিলা আবার একটু যেনো মিটিমিটি হাসছে না? মন ভালো করা একটা অন্য রকম হাসি। এবার পাল্টা প্রশ্ন না করে পারলো না তৃষা। “আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”

“আমিও জলপাইগুড়ি যাচ্ছি। ওখানে মেয়ে থাকে আমার। দীর্ঘদিন দেখিনি। ভাবলাম এবার পুজোয় একটু খবরাখবর নিয়ে আসি।”

আবার ক্ষণিকের নিরবতা। “পুজোতে করা শাড়ি হলো তোমার মায়ের?” প্রশ্নটা শুনে রীতিমতো অবাক তৃষা। অচেনা অজানা একজনকে এই প্রশ্ন যেন কতদিন না চেনেন উনি ওর মাকে। তবুও উত্তর দে তৃষা। ” পাঁচটা” ” বাহ্ খুব ভালো।”

কথার ফাঁকে কখন যেনো ঢুলুনি এসে গিয়েছিল। চোখ মেলে দেখলো বৃদ্ধা একমনে উল বুনছেন। উল বোনার এই ধরনটা চেনে ও। মা ওর জন্য এই ধরনের বোনা একটা সোয়েটার বানিয়ে দিয়েছিল। ঘড়িতে দেখলো বারোটা। নাহ্ এবার টানটান হয়ে শোওয়া দরকার। নিজের আপার বার্থ টায় উঠে ঘুমিয়ে পারলো ও। সকাল হয়ে এসেছে। সূর্যের ছটা এসে আলোকিত করেছে গোটা কামরাকে। ঘুম ভাঙলো তৃষার। নীচে নেমে এলো। ট্রেন এখনও এন জে পি পৌঁছায়নি। অথচ ভদ্রমহিলা নেই। উনিও তো বলছিলেন জলপাইগুড়ি যাবেন। তাহলে নামলেন কোথায়? আগের রাতের খবরের কাগজ পড়া ভদ্রলোকটি চা খাচ্ছিলেন।

“এখানে যে ভদ্রমহিলা ছিলেন উনি কোথায় বলতে পারেন?”

“আপনি কার কথা বলছেন ম্যাডাম?” লোকটি যেন আকাশ থেকে পড়লো।

“যিনি আমার সাথে মালদা থেকে উঠলেন।”

“আপনার সাথে আর তো কেও ওঠেনি।”

“কী পাগলের প্রলাপ বকছেন?”

“পাগল তো আমি আপনাকে ভাবছিলাম ম্যাডাম। নিজের মনে কথা বলে চলেছেন। তবে এখন তো দেখছি আপনি বদ্ধ পাগল” একটু থামল লোকটা ” আমার কথা বিশ্বাস না হলে কামরার যেকোনো লোককে জিজ্ঞেস করুন এই কুপে আমি আপনি ছাড়া আর কেও ছিল কী না।”

না বিশ্বাস করেও যেনো করতে পারছে না তৃষা। হতভম্বের মত বসে পড়লো ও। ট্রেন এন জে পি পৌঁছে গেছে। ঘন্টা খানের পরে বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল ও। ওর মাথায় একটা চিন্তা ঘুরছে। ঘরে ঢুকেই হাঁক পাড়ল মায়ের উদ্দেশ্যে “মা, তোমার পুরনো অ্যালবামটা বের কর না।” তৃষার মা তো অবাক ” এসে এসেই অ্যালবাম দিয়ে কি করবি?” “আরে বের কর না” এক এক করে পৃষ্ঠা উল্টে চলেছে। দিদা গত হয়েছেন অনেকদিন। ও ওর দিদাকে দেখেনি। দিদার ছবি আছে এই অ্যালবামে। তবে এই অ্যালবাম বেশিবার খোলা হয়নি। খুললেই মা কেঁদে ফেলে যে। অবশেষে চোখ এসে আটকেছে দিদার ছবিতে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তৃষা। ওদিক থেকে মা বলেই চলেছে “কী রে, কী খুঁজছিস বললি না তো!” কী বলবে ও? ও যে চিনতে পারেনি পুজোর আগে দিদা এসেছিল ওদের খোঁজ নিতে!

© নবনীতা সরকার



Designed & Developed with ❤
by Nabanita Sarkar © 2021