অন্তিম আশা

June 07, 2019

।। ১।।

নাঃ। আর পারা যাচ্ছে না। ব্যাগটা চেয়ারের ওপর ছুঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিয়াশা। কলেজের নিত্যদিনের চাপ, বন্ধুদের টিটকারি, বাবা মায়ের মাত্রাতিরিক্ত আকাঙ্খা --- সবকিছুর ভার নিঃশব্দে গুটিগুটি পায়ে এসে নুব্জ করে দিয়েছে নিয়াশাকে। “ক্লাসের চেয়ে মনটা বাইরে কেন বেশি থাকে?” “ইস্, তোর ড্রেসিং সেন্স বলে কিছুই নেই, কী যাতা!” “এত টাকা খরচ করে পড়ানো হচ্ছে। বাবা মায়ের নামটা উজ্জ্বল করতে হবে তো নাকি?”। টুপ করে একটা জলবিন্দু নেমে এলো ওর গাল বেয়ে। শরীর টা এলিয়ে দিল হোস্টেলের বিছানায়। “আচ্ছা আমি যদি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাই এই দুনিয়া থেকে খুব কি ক্ষতি হবে…?” দরজাটা ধড়াম করে খুলে গেলো। “এই জানিস নিয়াশা, আজ না কলেজে…”। উফ্ আবার। রুমমেটের নিত্যদিনের কচকচানি শুনতে চায়না ও। অবশ্য তিতলির তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। ও বকেই চলেছে। লঘুপায়ে বাথরুমের দিকে চলে গেলো নিয়াশা। ছিটকিনি লাগিয়ে দিল। মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে। আর মনের মধ্যে ভাঙা রেকর্ড প্লেয়ারের মত বেজে চলেছে রোজকার বাঙ্গবিদ্রুপগুলো। বাইরে জোর চিৎকার হচ্ছে না? এ আর নতুন কি। হোস্টেলে প্রায়ই হয়। ও জলের ঝাপটা দিয়ে চলেছে। আর মাঝে মাঝে আরশিতে দেখছে নিজের ক্লান্ত মুখটাকে। হঠাৎ যেন ঘোর কাটল ওর। মেঝেটা খুব জোরে দুলছে না? সর্বনাশ! ভূমিকম্প! লাফ দিয়ে দরজা খুলে বেরোলো নিয়াশা। ছুট লাগলো। কিন্তু হঠাৎই একটা সিমেন্টের চাঙড় ভেঙে পড়লো ওর পাশে। তারপর আরও কয়েকটা পড়লো সামনে। সিঁড়ি পর্যন্ত যাওয়া যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিল ও। নিজের ঘরে ছুটে গেলো। কী মনে হল ফোনটা নিল আর ঢুকে পড়লো খাটের নীচে। ঘরের মধ্যেও প্রলয় শুরু হল। হঠাৎ মনে হলো মেঝেতেও বুঝি ফাটল ধরছে। তারপর সব অন্ধকার।

।।২।।

-— “আজকের ভূমিকম্পটা কী জোরালো ছিল বাপরে!”

-— “আর অনেকক্ষন ধরেও হল , বল।”

অশোক আর বৃষ্টি ভূমিকম্পের সময় বাইরে বেরিয়েছিল। তারপর পাড়া- প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলোচনা করে এই সবেমাত্র বাড়িতে ঢুকল।

-—“আমি নিয়াশাকে একটা কল করি।”

-—” হ্যাঁ করো। আমি একটু টিভিটা চালিয়ে বসি।”

ব্রেকিং নিউজ : দুর্গাপুরের একটি কলেজের গার্লস হোস্টেল ধূলিস্যাৎ হলে গেছে আজ সন্ধ্যার ভূমিকম্পে। চমকে টিভির দিকে নজর ফিরলো বৃষ্টির।নিউজ রিপোর্টার ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেছে। টিভির পর্দায় ফুটে উঠলো অকুস্থলের ছবি। আরে এ যে নিয়াশারই হোস্টেল! অকস্মাৎ বজ্রপাত হল অশোক আর বৃষ্টির মাথায়।

-—“তু- তুমি নিয়াশাকে ফোনে পাচ্ছ না?”

-—” রিং হয়ে চলেছে । ধরছে না।”

-— “আহা ধরবে কী করে। ছুটে বেরিয়েছে ওই সময়…” একটা হাঁফ ছাড়ল অশোক “… ফোন কী আর নিয়েছে।”

-—” কিন্তু ওর সব বন্ধুগুলোকে তো টিভিতে দেখতে পাচ্ছি। ওর রুমমেট তিতলিকেও দেখলাম। নিয়াশাকে তো দেখলাম না।”

-—” আছে ওই ভিড়ের মধ্যে। সবাই তো বাইরে খোলা মাঠে জড়ো হ…”

না, কথাটা শেষ করতে পারলো না অশোক। কারণ তার আগেই নিউজ রিপোর্টার বলে উঠেছে “এখনও পর্যন্ত একটি মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নাম নিয়াশা মুখার্জী। ওর রুমমেটের কথা অনুযায়ী ভূমিকম্পের কিছুক্ষণ আগে ও রুম থেকে বেরিয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে তাকে আর দেখা যায় নি।” একটা করে জলবিন্দু গড়িয়ে পড়লো বৃষ্টি আর অশোকের গাল বেয়ে।

।।৩।।

ওর ফোনের রিংটোন টা বেজে চলেছে না অনবরত? আস্তে আস্তে চোখ খুললো নিয়াশা। চারিদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। নড়বার চেষ্টা করল। না বেশি নড়াচড়া যাচ্ছে না। হাতে মুঠো করা আছে ফোনটা। ফোনটা কিছুক্ষণ আগে বাজছিল না? কোনরকমে হাতটা কাছে নিয়ে এলো। মা - ৩ টে মিসড কল। বাকরুদ্ধ বৃষ্টি ধপ করে বসে পড়েছে সোফায়। কিছু ভাবতে পারছে না ও। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। নিয়াশা! ঝটতি ফোন তুললো বৃষ্টি।

-— “মা…”

-—” নিয়াশা…তুই কোথায় মা?”

ফুপিয়ে উঠল বৃষ্টি। নিয়াশা বুঝে গেলো খবরে ঘটনাটা দেখিয়ে দিয়েছে আর ওকে যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেটাও মা জানে।

-—“ভেরি ফানি মা।” একটু হাসলো নিয়াশা। “আমি ধ্বংস স্তূপের মধ্যে।”

ততক্ষণে বৃষ্টির কাছ থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিয়েছে অশোক।

” মা, তোর কষ্ট হচ্ছে নাতো?” ---” একটু তো হচ্ছে। বাট তোমরা কাজের কাজটা আগে কর।” নিজেকে স্টেডি করল নিয়াশা। ” তিতলিকে ফোন করে বল আমাকে যেন কল করে। সেই আওয়াজে আমার পজিশন বুঝতে পারবে আর রেসকিউ টিম উদ্ধার করতে পারবে। এক্ষুনি বল।”

-—” হ্যাঁ, বলছি মা। তুই একটু ধৈর্য ধর।”

হুম্। ধৈর্য ধরতে হবে ওকে। শ্বাস নিতে একটু কষ্ট হচ্ছে না? অক্সিজেন কমে আসছে বোধহয়। না সবটা শেষ হওয়ার আগে ও মুক্ত প্রাঙ্গণের খোঁজ পাবে। আশায় বুক বেঁধে অঘোর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়ল নিয়াশা।

।।৪।।

আজকের আকাশটা বড্ড বেশি নীল। সূর্যের কিরণ ও ঝিকমিকিয়ে উঠেছে। এমনই একটা সূর্যরশ্মি জানালার কাচ ভেদ করে এসে পড়ল নিয়াশার চোখের পাতায়। চোখ মেলল ও। ওই অতলস্পর্শী অন্ধকারের পর এমন উজ্জ্বল সকাল ! চারদিকে চেয়ে বুঝল ও কোনো নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে আছে। পাশের টেবিলে একটা সুন্দর ফুলের তোড়া রাখা। নীচে একটা চিরকুটে লেখা “ফ্রম ইওর ক্লাসমেটস্ ”। আর একটা চকলেটের বাক্স “ফ্রম তিতলি”। আবছা একটা স্মৃতি ভেসে উঠলো ওর মনে। ওকে উদ্ধার করার পর তিতলি এসে জড়িয়ে ধরেছিল। ঘিরে ধরেছিল অন্য বন্ধুরাও। হঠাৎ দরজা খুলে গেল। ছুটে এল অশোক আর বৃষ্টি। নিয়াশাকে বুকে চেপে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো বৃষ্টি।

“মা, আর কোনোদিন আমাদের এভাবে ভয় দেখস না।” রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল অশোক। জানালার দিকে চোখ ফেরাল নিয়াশা। হ্যাঁ ওই গহন কালো আঁধারের পর এমন রবির কর মাখা প্রভাতও আসে --- ঠিক জীবন প্রবাহের মতোই।



Designed & Developed with ❤
by Nabanita Sarkar © 2021